প্রবাসীদের কষ্টের স্ট্যাটাস মূলত তাদের একাকিত্ব, পরিবার থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা এবং কঠোর পরিশ্রমের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে। জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকলেও মন সবসময় পড়ে থাকে নিজের বাড়ি, মা-বাবা ও প্রিয়জনদের কাছে। এসব স্ট্যাটাসে লুকিয়ে থাকে না বলা অনেক কষ্ট, ত্যাগ আর সংগ্রামের গল্প।
তারা হাসিমুখে কাজ করলেও ভিতরে থাকে চাপ ও দুশ্চিন্তা। সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের লেখা শেয়ার করলে মানুষ তাদের অনুভূতি বুঝতে পারে এবং সহানুভূতি দেখায়। এটি শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়, বরং প্রবাসীদের শক্ত মনোবল, স্বপ্ন আর পরিবারের জন্য ভালোবাসারও প্রতিফলন।
প্রবাসীদের কষ্টের স্ট্যাটাস
প্রবাসীদের জীবনটা অনেকটা মোমবাতির মতো, নিজে তিলে তিলে শেষ হয়ে যায় কিন্তু পরিবারের অন্য সবার অন্ধকার ঘরটা আলোকিত করে রাখে।
মা যখন ফোনে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, শরীর কেমন আছে?” তখন বুকের ভেতরটা ফেটে যায়। অথচ মুখে বলতে হয়, “খুব ভালো আছি মা।”
বিদেশের মাটিতে আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো চোখের জল আর একাকীত্ব। এখানে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো আপন কেউ নেই।
আমরা প্রবাসীরা হয়তো অনেক দামী জামা গায়ে দিই, কিন্তু আমাদের মনটা সবসময় দেশের সেই জীর্ণ মাটির ঘরের টানেই ব্যাকুল থাকে।
প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা হলো মায়ের হাতের এক থালা গরম ভাত। বিদেশের পাঁচতারা হোটেলে হাজার পদের রান্নাও সেই তৃপ্তি দিতে পারে না।
ঈদ আসে, ঈদ যায়, কিন্তু প্রবাসীদের জন্য কোনো ঈদ নেই। আমাদের ঈদ মানে ডিউটি শেষে ক্লান্ত হয়ে রুমে ফিরে একাকী চোখের জল মুছা।
দেশের মানুষের কাছে আমরা কেবল ‘টাকা ছাপানোর মেশিন’। কিন্তু এই মেশিনের ভেতরেও যে একটা রক্ত-মাংসের মানুষ আছে, তা কেউ বুঝতে চায় না।
নিজের বাচ্চার বেড়ে ওঠা আমরা কেবল ফোনের ছোট স্ক্রিনেই দেখি। প্রথম কথা বলা কিংবা প্রথম হাঁটা—সবই আমাদের মিস করতে হয়।
প্রবাসীদের কোনো উইকেন্ড নেই। ছুটির দিনে সবাই যখন আনন্দ করে, তখন আমরা ঘরের কাজ গুছিয়ে নিয়ে আবার পরের সপ্তাহের লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিই।
বিদেশের মাটিতে একা মরে যাওয়ার ভয়টা প্রতি রাতে আমাদের তাড়া করে। আমরা কেবল এক জীবন্ত লাশ হয়ে এখানে পড়ে আছি।
আমাদের ঘাম ঝরানো টাকায় যখন দেশের বাড়িতে হাসি ফোটে, তখন মনে হয় প্রবাসের সব কষ্টই সার্থক। আমরা তো অন্যের সুখের জন্যই জন্মেছি।
প্রবাস জীবন আমাদের কঠিন হতে শিখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভিতর থেকে আমাদের মায়া-মমতাগুলো কেড়ে নিয়ে গেছে। আমরা এখন এক যান্ত্রিক মানুষ।
বাবা-মায়ের শেষ বিদায়ে পাশে থাকতে না পারার যে হাহাকার, তা কেবল একজন প্রবাসীই বোঝে। এই আক্ষেপ সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
বিদেশের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যখন হঠাৎ করে বাংলা কথা কানে আসে, তখন মনে হয় যেন এই মুহূর্তে নিজের বাড়ি পৌঁছে গেলাম।
প্রবাসীরা হলো মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই অদৃশ্য খুঁটি, যা ভেঙে পড়লে পুরো ঘরটাই তছনছ হয়ে যাবে। তাই আমাদের ভেঙে পড়ার কোনো অধিকার নেই।
বিদেশের আকাশে যখন বৃষ্টি নামে, তখন জানলার পাশে বসে দেশের বৃষ্টির ঘ্রাণ হাতড়াই। প্রবাসের বৃষ্টি আমাদের কেবল ভেজায়, মন শীতল করে না।
প্রবাস মানে হলো নিজের যৌবনকে মরুভূমির তপ্ত বালুর নিচে সমাহিত করা। যখন আমরা বাড়ি ফিরি, তখন সঙ্গে থাকে কেবল একরাশ রোগ আর ক্লান্তি।
বাড়ির প্রতিটি উৎসবে আমাদের চেয়ারটা খালি থাকে। ফোনের ওপাশ থেকে হাসি শুনতে পাই ঠিকই, কিন্তু সেই হাসিতে আমাদের কোনো ভাগ থাকে না।
আমরা প্রবাসীরা নিজেরা ভালো না থাকলেও সবসময় বলি, “আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।” আমাদের এই ‘ভালো থাকা’র আড়ালে কত দীর্ঘশ্বাস লুকানো থাকে তা কেউ জানে না।

প্রবাসীদের কোনো পার্মানেন্ট ঠিকানা নেই। বিদেশের মাটিতে আমরা অস্থায়ী শ্রমিক, আর দেশে গেলে আমরা কেবল কয়েকদিনের মেহমান।
প্রবাস জীবনের সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত হলো যখন শোনেন আপনার প্রিয়জন আপনাকে ভুলে অন্য কাউকে নিজের করে নিয়েছে।
নিজের দেশের সেই জ্যাম আর ধুলোবালিকেও আজ খুব মিস করি। প্রবাসের এই চাকচিক্য আর আধুনিকতা আমাদের শান্তি দিতে পারে না।
আমরা তো কেবল একটা পাসপোর্ট নম্বর মাত্র। বিদেশের কাছে আমরা লেবার, আর দেশের কাছে আমরা কেবল রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
ক্লান্ত শরীরে যখন ডিউটি শেষে ঘরে ফিরি, তখন মনে হয় ইশ! কেউ যদি এক গ্লাস জল এগিয়ে দিত। প্রবাসে নিজের যত্ন নিজেকেই নিতে হয়।
যখন দেখি দেশের বন্ধুরা একসাথে আড্ডা দিচ্ছে, তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ডিউটিতে মন দিতে হয়। আমরা তো কেবল কাজ করতে এসেছি।
মা-বাবার বার্ধক্য আমরা দূর থেকে দেখি। তাঁদের সেবা করতে না পারার যন্ত্রণা আমাদের প্রতিটি দিন তিলে তিলে শেষ করে দেয়।
দেশের মানুষের অবহেলা যখন গায়ে লাগে, তখন মনে হয় কেন দেশ ছাড়লাম? কিন্তু খালি পকেট আর পরিবারের কথা মনে হলে সব মুখ বুজে সয়ে নিতে হয়।
সবশেষে একথাই সত্যি প্রবাসীরা হলো সেই মোমবাতি যারা আলো দিতে দিতে এক সময় নিভে যায়, কিন্তু কেউ তার ত্যাগের খবর রাখে না।
প্রবাস জীবন নিয়ে কিছু কথা
প্রবাস মানে হলো এক বুক হাহাকার নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাসিমুখের অভিনয় প্র্যাকটিস করা, যাতে ভিডিও কলে মা কষ্ট না পায়।
নিজের দেশের রাস্তার ধুলোবালির যে ঘ্রাণ, প্রবাসের এই এসির ঠান্ডা বাতাসে তার এক ভাগ শান্তিও খুঁজে পাওয়া যায় না।
প্রবাসীদের জীবনটা অনেকটা স্টপেজহীন ট্রেনের মতো, যেখানে গন্তব্য কেবল কাজ আর কামাই; নিজের জন্য কোনো বিশ্রাম নেই।
মা-বাবার বার্ধক্যটা আমরা কেবল ছবির মাধ্যমেই দেখি। তাঁদের চুলে যে সাদা রং ধরেছে, তা স্পর্শ করে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয় না।
বিদেশের মাটিতে আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ‘একাকীত্ব’। হাজার মানুষের ভিড়েও মনে হয় আমি এক জনমানবহীন দ্বীপে বন্দি হয়ে আছি।
যখন দেশে কারো বিয়ের খবর পাই, তখন মনে পড়ে সেই রঙিন বিকেলগুলোর কথা। আজ চার দেয়ালের মাঝে ডিউটি শেষে একাকী ডাল-ভাতই আমাদের উৎসব।
প্রবাস মানে হলো নিজের আবেগগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একটা রক্ত-মাংসের রোবটে রূপান্তরিত হওয়া। আমাদের প্রোগ্রামিংয়ে কেবল ‘কাজ’ শব্দটা সেট করা।
বাড়ির সবাই যখন নতুন আসবাবপত্র বা গয়না নিয়ে মেতে থাকে, আমরা তখন ওভারটাইমের চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলি। আমাদের ত্যাগ কেবল আমরাই জানি।
বিদেশের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে যখন কোনো অচেনা বৃদ্ধকে দেখি, তখন নিজের বাবার মুখটা ভেসে ওঠে। বুকটা হু হু করে ওঠে এক অজানা ব্যথায়।
আমাদের পাঠানো টাকায় যখন ভাইবোনের পড়ালেখা শেষ হয়, তখন নিজেদের অশিক্ষিত আর শ্রমিক পরিচয়টাকেও খুব গর্বের মনে হয়।
প্রবাসীদের জন্য ‘ছুটি’ মানে হলো কেবল এক জোড়া বাড়তি মোজা ধোয়া আর দেশের মানুষের সাথে ফোনে একটু বেশি সময় কথা বলা।
যখন বিদেশের আকাশে চাঁদ ওঠে, তখন মনে হয় এই চাঁদটাই তো এখন আমার দেশের মাটির ওপর আলো ছড়াচ্ছে। দূরত্বটা তখন খুব বেশি মনে হয়।
বিদেশের হাসপাতালে শুয়ে যখন কেউ একা গোঙায়, তখন বোঝা যায় এ পৃথিবীর মায়া কতটা ফিকে। এখানে টাকা আছে, কিন্তু মাথার কাছে বসার কেউ নেই।
আমরা প্রবাসীরা হয়তো অনেক দামী পারফিউম ব্যবহার করি, কিন্তু আমাদের গায়ে লেগে থাকে কেবল হাড়ভাঙা খাটুনির ঘাম আর বিরহের গন্ধ।
প্রবাস মানে হলো প্রতিটা দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় একটা করে ক্রস চিহ্ন দেওয়া, আর হিসেব করা আর কতদিন পর নিজের ভিটায় ফিরতে পারব।
নিজের ছোট বোনটার বিয়ে হয়ে গেল, অথচ বড় ভাই হিসেবে পাশে দাঁড়িয়ে আশীর্বাদ করার সুযোগটুকুও পেল না এই পরবাসের চাকরিতে।
যখন দেখি দেশের মানুষ প্রবাসীদের নিয়ে ট্রল করে, তখন মনে হয় ইশ! যদি একটা দিন আমাদের জুতোয় পা দিয়ে দেখতেন প্রবাস কত কষ্টের।
আমাদের আয়ু বাড়ছে না কি কমছে জানি না, তবে প্রতিটা দিন আমরা আমাদের যৌবনটাকে বিদেশের মরুভূমিতে বিসর্জন দিচ্ছি।
প্রবাসীদের বালিশগুলো যদি কথা বলতে পারত, তবে দুনিয়ার সবচেয়ে করুণ কান্নার গল্পগুলো আজ সবার জানা হয়ে যেত।
বাবার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর যখন ডিউটি থেকে ছুটি মেলে না, তখনকার সেই মানসিক যন্ত্রণা কেবল একজন প্রবাসীই সইতে পারে।
বিদেশের মাটিতে আমরা সবাই সমান; এখানে ডিগ্রি বা আভিজাত্যের দাম নেই। এখানে সবাই কেবল ‘বিদেশি’ নামের এক পরিচয়ে পরিচিত।
বাড়ির কুকুরটাও হয়তো আমাদের দেখলে এখন ডাকবে, কারণ আমরা এতটাই পর হয়ে গেছি যে আমাদের গায়ের গন্ধটাও সে ভুলে গেছে।
প্রবাসীদের ইফতার মানে হলো এক হাতে মোবাইল আর অন্য হাতে এক টুকরো খেজুর; পরিবারের হাসি দেখার তৃষ্ণাতেই আমাদের তৃষ্ণা মিটে যায়।
বিদেশের মাটিতে আমাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই। আমরা কেবল কিছু নম্বর আর ওয়ার্ক পারমিট কার্ডের সমষ্টি মাত্র।
যখন দেখি দেশের বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছে, তখন মনে হয় টাকা দিয়ে সব কেনা গেলেও হারানো সময় আর বন্ধুত্ব কোনোদিন কেনা যায় না।
প্রবাস মানে হলো নিজের বাচ্চার প্রথম ‘বাবা’ ডাকটা ফোনের স্পিকারে শোনা। সেই ডাক শুনে বুকটা ফেটে গেলেও মুখে হাসি রাখতে হয়।

বিদেশের চাকচিক্য আমাদের চোখ ধাঁধাতে পারে, কিন্তু আমাদের অন্তরটা সবসময় সেই ছায়া সুনিবিড় গ্রাম আর কাদা-মাটির পথেই পড়ে থাকে।
প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো সব থেকেও কিছু না থাকা। আমাদের ঘর আছে কিন্তু তাতে মায়া নেই, খাবার আছে কিন্তু তাতে স্বাদ নেই।
বাড়ির মানুষ যখন বলে ‘কবে টাকা পাঠাবি?’, তখন একবারও জানতে চায় না ‘আজ অনেক রাত হয়েছে, তুই কি ঘুমিয়েছিস?’
যখন বিদেশের রাস্তায় কুয়াশা জমে, তখন মনে হয় এই কুয়াশা হয়তো আমার দেশের সেই শীতের সকালের কথা মনে করিয়ে দিতেই এসেছে।
আমরা যখন দেশে ফিরি, তখন আমাদের সুটকেস ভর্তি উপহার থাকলেও আমাদের বুকের ভেতরটা থাকে এক বিশাল শূন্যতায় ভরা।
প্রবাসীদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস হয়তো আসমান পর্যন্ত পৌঁছায় না, কিন্তু প্রতিটি রাতের দীর্ঘশ্বাস আমাদের আয়ু কেড়ে নেয়।
প্রবাস মানে হলো নিজের স্বাধীনতার বিনিময়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা কেনা। আমরা সবাই এখানে সোনার খাঁচায় বন্দি পাখি।
যখন মা বলে ‘তোর জন্য পছন্দের পিঠা বানিয়েছি’, তখন মনে হয় এই সাত সমুদ্র তেরো নদী যদি এক লাফে পার হওয়া যেত!
বিদেশের খাবারগুলো পেটের ক্ষুধা মেটায় ঠিকই, কিন্তু মনের ক্ষুধা মেটানোর মতো এক দলা ভাত আর শুঁটকি ভর্তা এখানে দুর্লভ।
প্রবাস মানে হলো নিজের জন্মদিনটা একাকী চার দেয়ালের মাঝে ডায়েরিতে লিখে রাখা। এখানে উইশ করার মতো কেউ নেই।
আমরা প্রবাসীরা যখন বৃদ্ধ হই, তখন বুঝতে পারি টাকা কামাতে গিয়ে আমরা আসলে জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলোই হারিয়ে ফেলেছি।
বাড়ির নতুন ঘরে আমরা হয়তো কোনোদিন শোয়ার সুযোগ পাব না, কিন্তু সেই ঘরের প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে আমাদের ঘাম লেগে আছে।